রাফেল-বফোর্স তর্জা না---উন্নয়ন কোনটা জরুরী?

লেখক
সুকুমার সরকার

বোফোর্স কেলেঙ্কারী নিয়ে রাজীব গান্ধীর বিরুদ্ধে নানান কথা উঠেছিল৷ তার পরেও কংগ্রেস বেশ কয়েকবার ক্ষমতায় এসেছে ৷ কেননা, সরকার গড়তে যারা ভোট দেয় তারা এসব বোফোর্স ঠোফোর্স বোঝে না৷ সম্প্রতি নরেন্দ্রমোদীকে নিয়ে রাফেল কেলেঙ্কারীরর যে কথা বলে কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধী গলা ফাটাচ্ছেন, সেটাও ভারতীয় ভোটারদের একটি বিরাট অংশ কিছুই বুঝবে না৷ উল্টে এ ধরনের কথায় কিংবা ভিডিও টুইটে সাধারণ ভোটারদের মনে রাহুল গান্ধীর ইমেজে কিঞ্চিৎ হলেও নেগেটিভ প্রভাব পড়ছে৷ কেননা, এই মুহূর্তে ভারতীয় ও ভোটারদের কাছে অন্য অনেক ইস্যু বেশি জরুরি৷ বিশেষ করে কৃষি উন্নয়ন , ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশ বেকার সমস্যা দূরীকরণের মতো বিষয়গুলির ক্ষেত্রে৷ মহারাষ্ট্রের কর্ষক আন্দোলনকে সমর্থন করে তাঁর আন্দোলন যে প্রাজ্ঞতার দিকে ধাবিত হচ্ছিল, সেইসব ইস্যু দেখে অনেকেই রাহুল গান্ধীকে ভারতের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী ভাবার কথা বলতে শুরু করেছে৷ কিন্তু ভারতবর্ষের মতো দেশে প্রধানমন্ত্রী হতে গেলে যে ধরনের প্রাজ্ঞতার দরকার রাহুল গান্ধী সেই ধরনের প্রাজ্ঞতার পরিচয় দিতে অন্য বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ব্যর্থ হচ্ছেন৷ নরেন্দ্র মোদিকে ঠেকাতে এমন এমন নেতা-নেত্রীদের সঙ্গে হাত মেলাবার কথা বলছেন যা নিতান্তই বালসুলভ৷

রাষ্ট্র-প্রধানদের এই ধরনের কেলেঙ্কারির পিছনে রাজনীতির যে চক্রান্তে কাজ করে ভোটাররা তা বুঝতে পারে না৷ তারা বোঝে মোটা ভাত মোটা কাপড় ৷ সুতরাং তাদের মন জয় করতে মোটা ভাত মোটা কাপড়ের ব্যবস্থার কথা বলাটাকেই প্রধান ইস্যু করে লড়তে হবে৷ অর্থাৎ কৃষি উন্নয়ন , শিল্প উন্নতি, বেকার সমস্যা সমাধানের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোকে বেশি করে তুলে ধরতে হবে৷

অবশ্য কংগ্রেসের হাতে এসব ইস্যুর সমাধানের কোনো দাওয়াও নেই৷ কেননা , অতীতে অনেক বছর ধরে, অনেকবার কংগ্রেস ক্ষমতায় এসেছে, থেকেছে কিন্তু এই ইস্যুগুলির সমাধানে কোনো বলিষ্ঠ পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি বা করতে পারে নি৷ আবারও ক্ষমতায় এলেও যে করতে পারবেন না বা করবেন না, তা বলার অপেক্ষা রাখে না৷ তবুও এই মুহূর্ত্তে নরেন্দ্র মোদীর বিকল্প হিসেবে যেহেতু রাহুল গান্ধীর কথা অনেকে ভাবতে শুরু করেছেন সেহেতু বলবো, রাহুল গান্ধীর বক্তব্য আরও বেশি গঠনমূলক হওয়া বাঞ্ছনীয়৷

ঊনিশের লোকসভা নির্বাচন ভারতবর্ষের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় সরণি৷ এই সরণি বেয়ে ভারতবর্ষের জন্য অনেক সার্থকতা বা ব্যর্থতার ভবিতব্য প্রবেশ করবে৷ কেননা , বর্তমান ভারতবর্ষ যেখানে এসে দাঁড়িয়েছে তার প্রতিপক্ষ হিসেবে বর্তমানের চীন ও পাকিস্তান বিরাট একটি বিষয়৷ অতীতের চীন আর আজকের চীনের মধ্যে বিরাট ফারাক৷ অতীতের চীনের লক্ষ্য ছিল, নিজেদের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের প্রতি৷ কিন্তু বর্তমানের চীন নিজেদের আর্থিক ভিত মজবুত করে এখন বহির্বিশ্বে যথেষ্ট আগ্রাসী হয়ে উঠেছে৷ আমেরিকার প্রতি বাণিজ্য আগ্রাসন, ভারত -পাকিস্তানের প্রতি বাণিজ্য ও ভূমিজ আগ্রাসন চীনকে একগুয়ে করে তুলেছে৷ সম্প্রতি ডোকালাম ইস্যু, নেপালের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি ইস্যুতে ভারতকে কোণঠাসা করার বিষয়ে চীনের সে মনোভাব আরও স্পষ্ট হয়েছে৷ এমতাবস্থায় ভারতবর্ষের যেকোনো দুর্বল সরকার ভারতবর্ষের জন্য মারাত্মক বিপদের কারণ হবে৷

চীন যেমন দীর্ঘ সময় ধরে নিজেদের অর্থ-সামাজিক উন্নয়নে নিজেদের রাজনীতিকে একমুখী করে রেখেছিল, ভারতবর্ষেরও উচিত ােতমন কোনো একক আর্থ-সামাজিক দর্শনের আলোকে নিজের দেশের উন্নয়নে সামিল হওয়া৷ সেটা তো ভারতীয় রাজনৈতিক নেতারা করছেনই না উল্টে অপ্রাসঙ্গিক ইস্যুগুলোকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে এমন সব পরিস্থিতির সৃষ্টি করছে, যাতে জনগণ তো বিভ্রান্ত হচ্ছেই, বহিশত্রুরাও অগ্রসনের সুযোগ পাচ্ছে৷

বর্তমানের ভারতবর্ষ যেখানে দাঁড়িয়ে আছে, সেখানে যদি শক্ত-পোক্ত কোনো রাষ্ট্রনায়ক (সারা দেশেই যার জনপ্রিয়তা তথা শক্ত ভিত্তি রয়েছে) ভারতবর্ষের ক্ষমতার আসনে না বসতে পারে তা হলে দেশ ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হবার সম্ভাবনা আছে৷

আসলে এই মুহূর্তে ভারতবর্ষে ভীষণভাবে হিন্দুত্ববাদের সেন্টিমেন্ট নিয়ে বিজেপি এগোবার চেষ্টা করছে, তা বহু ধর্মমতের ভারত বর্ষের জন্য কোনো ফলদায়ক ইস্যু নয়৷ এই হিন্দুত্ববাদের সেন্টিমেন্টে ভারতবর্ষের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নেরও সম্ভাবনা নেই৷তাই বিজেপি এই সেন্টিমেন্টে ভারতবর্ষের ক্ষমতায় এসেও সাধারণ মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের মুখ হতে পারেনি৷ যা হয়েছে তা কেবল ভারতীয় পুঁজিপতিদের মুখ৷ আর পুঁজিপতিদের নিরিখে আর্থিক গ্রোথ সাধারণ মানুষের উন্নয়নের মাপকাঠি হতে পারে না৷ দরকার জনগণের উন্নয়নের নিরিখে আর্থিক গোথ৷ অবশ্য কংগ্রেসের ইস্তেহারেও সেই ধরনের গ্রোথের বিষয় উল্লেখের কোনো দিশা নেই৷

আসলে বর্তমান ভারতবর্ষের জন্য দরকার সেই ধরনের জাতীয় সেন্টিমেন্ট, যা একাধারে ধর্মমত নির্বিশেষে সকল ভারতীয়দের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নকে নিশ্চিত করবে অন্যদিকে বহিঃশত্রুর মোকাবেলার জন্য জাতীয় সেন্টিমেন্ট গড়ে তুলবে৷ যদিও সেই ধরনের সেন্টিমেন্ট জাগাবার জন্যে যে আর্থ-সামাজিক দর্শন বা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ব্যাপকভাবে সামনে আসা দরকার ছিল তা এখনো আসেনি৷ বিষয়টি এখনো পর্যন্ত কিছুটা তত্ত্বে ও দৃশ্যতঃ প্রাথমিক স্তরের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে সীমায়িত রয়ে গেছে৷ আর সেই আর্থ-সামাজিক দর্শন পুঁজিবাদ বিরোধী হওয়ায় ওই আর্থ-সামাজিক সেন্টিমেন্ট পুঁজিবাদীদের প্রচারসর্বস্ব যুগে প্রচারের সুযোগ পাচ্ছে না৷ অপ্রাসঙ্গিক হলেও বলে রাখি, সেই আর্থ-সামাজিক সেন্টিমেন্টটির নাম প্রাউট (প্রগতিশীল উপযোগ তত্ত্ব)৷

যাই হোক, ভারতবর্ষের জন্য এই মুহূর্তে দরকার এমন কোনো সরকার যাদের হাতে একাধারে থাকবে অভ্যন্তরীণ ঐক্য বজায় রাখার মতো আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের দিশা, অন্যদিকে থাকবে বহিঃশত্রু মোকাবেলার জন্য জাতীয় সেন্টিমেন্ট৷ রাহুল গান্ধীরা সেই পথের ছায়া না মাড়িয়ে ব্যষ্টিগত কুৎসা রটনার যে পথে হাঁটছেন তা দিয়ে খুব বেশি আশার আলো প্রজ্জ্বলিত হবে না৷ দিশা অধরাই থেকে যাবে৷ কিংবা ভুল পথে ভুল কোনো অযোগ্য নেতা-নেত্রী ভারতবর্ষের ক্ষমতার অলিন্দে এসে গেলে ভারতবর্ষকে অনিশ্চিততার দিকে ঠেলে দিতে পারে৷ সুতরাং ভারতীয় নির্বাচকমণ্ডলীকে এখনই ভালো করে ভাবতে হবে৷ ভারতে আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের জন্য প্রগতিশীল উপযোগতত্ত্বের আলোকে সরকার গঠন, না দর্শনহীন কিংবা সেন্টিমেন্টহীন পরস্পর বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলির অশুভ আতাতের মাধ্যমে অযোগ্য সরকার গঠন৷