মানুষের অস্তিত্ব ত্রিস্তরীয়৷ জাগতিক, মানসিক ও আধ্যাত্মিক---এই তিনটি স্তরেই যা কিছু অভাব, অনুপপত্তি বা সমস্যা তা দূর করার জন্য আমাদের কারও না কারো সহায়তা দরকার হয়৷ যাঁর সহায়তায় এই অভাব বা অন্ধকার দূর করা হয় তিনি গুরু, ‘গু’ শব্দের অর্থ অন্ধকার ‘রু’ শব্দের অর্থ হল দূর করা৷ যিনি আমাদের জাগতিক, মানসিক ও আত্মিক---এই তিন স্তরের অন্ধকার দূর করে দেন তিনিই গুরু৷
যিনি অ, আ, ক, খ, শেখান, গান শেখান, টেলারিং শেখান, কৃষিকার্য শেখান, শিল্পকর্ম শেখান ইত্যাদি তাঁরা সবাই গুরু, যিনি তত্ত্বোপদেশ দিয়ে মানসিক জগতের অন্ধকার দূর করে দেন তিনি গুরু৷ সাধনা পদ্ধতি শিখিয়ে যিনি আধ্যাত্মিক জগতের অন্ধকার দূর করে দেন তিনিও গুরু৷ এভাবে চোর, ডাকাত, গুণ্ডা--- তাদেরও গুরু থাকে৷ সাধারণ মানুষকে তার অভাব নিবৃত্তির জন্য গুরুর আশ্রয় নিতেই হয়৷ তবে আধ্যাত্মিক জগতের ক্ষেত্রেই ‘গুরু’ শব্দটি বেশী ব্যবহৃত হয়৷ যিনি মানস আধ্যাত্মিক জগতের অন্ধকার দূর করে দেন তাঁকে সাধারণতঃ ‘গুরু’ অভিধায় ভূষিত করি৷
গুরু শব্দের অনেক অর্থ ‘গুরু’ শব্দের অর্থ ভারী, ভাবে ভারী হলেও ‘গুরু’ শব্দ ব্যবহার করি৷ যেমন গুরুগম্ভীর ভাষা৷
ভাষায় ভারী হলেও ‘গুরু শব্দের ব্যবহার হয়, যেমন---গুরুচণ্ডালী ভাষা, ‘গুরু’ শব্দের অর্থ সম্মানিত সে অর্থে মাতা-পিতা এবং বাড়ীর বয়স্করাও গুরুজন৷
যাঁর কাছ থেকে কোন কিছু দান হিসাবে পাই তিনিও গুরু৷ এই হিসেবে যিনি লেখাপড়া শিখিয়েছেন, যিনি বৈবহারিক জীবনে কোন কিছু শিখিয়েছেন, যিনি আধ্যাত্মিক দর্শন শিখিয়েছেন, যিনি সাধনা পদ্ধতি শিখিয়েছেন তাঁরাও গুরু৷
‘গুরু’ বলতে পঞ্চপিতাকে বোঝায়---
‘‘বিদ্যাদাতা-অন্নদাতা-জন্মদাতা- তথৈব চ
কন্যাদাতা ভয়ত্রাতা পঞ্চৈব পিতরঃ স্মৃতা৷’’
‘‘যিনি লেখাপড়া শিখিয়েছেন, যিনি খাইয়ে পরিয়ে মানুষ করেছেন অর্থাৎ যিনি লৌকিক পিতা, যিনি কন্যাদান করেছেন অর্থাৎ শ্বশুর, যিনি বিপদ থেকে বাঁচিয়েছেন ---এই পাঁচজন পিতারূপে পূজ্য, এঁরা সবাই গুরু’৷
‘গুরু’ বলতে পঞ্চমাতাকে বোঝায়---
‘রাজপত্নী-গুরুপত্নী-মিত্রপত্নী- তথৈব চ,
পত্মীমাতা-স্বমাতা পঞ্চৈব মাতরঃ স্মৃতাঃ৷
‘রাজপত্নী অর্থাৎ দেশের যিনি রানী, যিনি গুরুর পত্নী, যিনি বন্ধুর স্ত্রী, যিনি পত্নীর মাতা অর্থাৎ শাশুড়ী, আর যিনি গর্ভধারিনী জননী---এই পাঁচজন মাতৃরূপ পূজ্য এঁরাও গুরু’
আনন্দমূর্ত্তিজী তাঁর আনন্দসূত্রমে বলেছেন---ব্রহ্মৈব গুরুরেকঃ নাপরঃ৷ অর্থাৎ ব্রহ্মই একমাত্র গুরু হতে পারেন৷ অন্য কেউ প্রকৃত গুরু হতে পারেন না৷ ব্রহ্মের যাবতীয় গূঢ়তত্ত্ব, ভূমাচৈতন্যের গোপন তত্ত্বগুলো একমাত্র ব্রহ্মই জানে না, জানতে পারে না, যতদিন পর্যন্ত তিনি কোন জাগতিক রূপ পরিগ্রহ করে অন্যকে তা শেখাচ্ছেন--- অন্যেরা জানবে কী করে? ব্রহ্ম ব্যতীত আর কেউ গুরু হতে পারেন না, তিনি বিশেষ আধারে নিজেকে ব্যক্ত করেন, সাধারণ মানুষ সেই মানবীয় আধারটিকে গুরু বলে ভাবেন, কিন্তু তা ঠিক নয়, গুরু সেই আধারের মাধ্যমে নিজেকে ব্যক্ত করছেন মাত্র৷ তান্ত্রিকেরা বলেন গুরু তিন প্রকার--- অধম গুরু, মধ্যম গুরু ও উত্তম গুরু৷ আনন্দমূর্ত্তিজীর ভাষায়---‘অধম গুরু কেবল বড় বড় ভাল ভাল কথা শুণিয়ে ও শিখিয়েই দায় খালাস (সারেন)৷ শিষ্য তা করছে কি করছে না সেদিকে নজর দেবার অবকাশ তার নেই৷
মধ্যম গুরু শিষ্যকে শেখান বটে, আবার খোঁজ ও নেন কতখানি কী করছে৷
আর উত্তম গুরু শিষ্যকে শেখান, খোঁজখবর নেন ও শিষ্যের মধ্যে সাধনাগত ত্রুটি দেখালে অবস্থার চাপ সৃষ্টি করে সাধনা করাতে বাধ্য করেন৷
উত্তম গুরু শিষ্যকে যেমন ভালবাসেন, ঠিক সেরকমভাবে শাসন ও করেন৷ ‘নিগ্রহাণুগ্রহে শক্তো গুরুরিতভিধীয়তে৷’ কেবল শাসন করলাম ভালবাসার মাত্রাকে যেন ছাপিয়ে না যায় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে৷
প্রকৃত গুরুকে ত্রিস্তরী গুরু হতে হবে, তিনটি স্তরে অর্থাৎ স্থূল জগতের সর্বস্তরে, মানসিক জগতের সর্বস্তরে ও আধ্যাত্মিক জগতের প্রতিটি দেশনায় তাঁকে অন্ধকার দূর করতে হবে৷ এদিক দিয়ে দেখতে গেলে একমাত্র মহাকৌলই গুরু হতে পারেন৷ অন্য কেউ নয়, যিনি নিজের জীবত্বকে সাধনার দ্বারা শিবত্বে সংস্থাপিত করেছেন তিনি কৌল আর যিনি নিজে করেন ও অন্যকে সে সম্পর্কে দিকদর্শন করাবার সামর্থ্য রাখেন তিনি মহাকৌল, অতীতে মহাকৌল এসেছিলেন শিব এবং কৃষ্ণ বর্তমানে আনন্দমূর্ত্তিজী এসেছেন মহাকৌলরূপে৷ মহাকৌলকে সাধনাজগতের সব কিছু পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে জানতে হবে, তাঁর শাস্ত্রজ্ঞান পুরোপুরি থাকতে হবে, শাস্ত্রজ্ঞান অর্জন করার জন্য যে সকল ভাষা জানা দরকার তাও জানতে হবে, যাঁর পাণ্ডিত্য নেই, বৈদগ্দ নেই, শাস্ত্রজ্ঞান নেই, ভাষাজ্ঞান নেই তিনি আধ্যাত্মিক জগতের গুরু হতে পারেন না অর্থাৎ থিওরির দিকটাও শিখিয়ে দিতে হবে এবং এইজন্য শাস্ত্রের উক্তি ও সমর্থনের প্রয়োজনও আছে৷
মানসিক জগতের অন্ধকার দূর করতে হলে মানুষের মনস্তত্ত্বের তাত্ত্বিক দিকটাও ভালভাবে জানতে হবে৷বইতে যেটুকু আছে তার থেকে সহস্রগুণ বেশী জানতে হবে, তাঁকে সর্ব বিদ্যায় পারদর্শী হতে হবে ও সর্বশাস্ত্রে সুপণ্ডিত হতে হবে, এই ধরণের গুরুরা সমাজে ধর্মগুরুরূপে পূজিত হয়ে আসছেন৷
মহাকৌল তারকব্রহ্ম শ্রীশ্রীআনন্দমূর্ত্তি যদি এখানেই থেমে থাকতেন তাহলে কারও কোন সমস্যা হত না৷ তিনি ধর্মগুরু হয়েও জাগতিক সমস্যা দূরীকরণে ব্রতী হয়েছেন৷ এখানেই অনেকের আপত্তি, কিন্তু জগদগুরু শ্রীশ্রী আনন্দমূর্ত্তিজী দমে যাওয়ার পাত্র নন, তিনি বুঝেছিলেন--- অন্নচিন্তা চমৎকারা, খালিপেটে ধর্ম হয় না, তাঁর কথায় --- ‘অন্ন চাই, বস্ত্র চাই, বাঁচার মত বাঁচতে চাই৷ চিকিৎসা চাই, নিবাস চাই, আর প্রয়োজন মেটাবার জন্য একদিন অবস্থার চাপে পড়ে ‘প্রাউট’ দর্শন তৈরী করতে বাধ্য হয়েছি৷ কারণ যে মানুষটা খেতে পাচ্ছে না, আগে তাকে অন্ন দেব, তারপর তাকে শেখাবো অধ্যাত্ম দর্শন৷ তারপর তাকে সাধনায় বসাবো৷ তাকে সাধানাতেই বসাবো, কিন্তু আগে তার পেট ভরাবার ব্যবস্থা করতে হবে তো, শীতের সময় তার বস্ত্রের ব্যবস্থা করতে হবে৷ এগুলো প্রাথমিক প্রয়োজন৷ এই প্রয়োজনপূর্ত্তি না হলে কখনো সামগ্রিকভাবে মানুষ জাতির উন্নতি সম্ভব নয়’
সারা বিশ্বের কল্যাণার্থে এই ‘প্রাউট’ দর্শন প্রদানের জন্যই তিনি স্বার্থান্বেষীদের বিরাগ ভাজন হয়েছেন৷ মিথ্যা অপবাদ দিয়ে তাকে জেলে ভরে বিষ প্রয়োগ করে হত্যারও চক্রান্ত করা হয়েছে৷ কিন্তু জীবের মঙ্গলের জন্য তিনি যা কর্তব্য বলে ভেবেছেন ভুলেও তা থেকে সরে আসেন নি৷ মানুষের আধ্যাত্মিক, মানসিক ও জাগতিক ক্ষেত্রে অন্ধকার ও অভাব দূর করার জন্য যা কিছু করা দরকার তার সবটাই জগৎবাসীকে উপহার দিয়েছেন৷ তাঁর কথায়--- ‘গুরু হতে গেলে আধ্যাত্মিক জগতে এক বিরাট যোগ্যতা, মানসিক জগতে বিরাট যোগ্যতা, আর জাগতিক জগতে দায়িত্বের হিমালয় প্রমাণ বোঝা মাথায় নিয়ে তাঁকে ধরাধামে অবতীর্ণ হতে হবে, সুতরাং গুরু হওয়া চাট্টিখানি কথা নয়’৷
- Log in to post comments