নারীর মর্যাদা

নইকো অবলা (মহিলা মহল)ঃ আমি নারী

 অদিতি বাগ

আমি নারী!

সুন্দর এই পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর  সৃষ্টি আমি৷

কখনও আমি বিদূষী মৈত্রী, ক্ষণা লীলাবতী৷

কখনও বা সতী সাবিত্রী সীতা অরূন্ধতী৷

আমার পূর্ণতা ষোড়শীর দর্পণে৷ 

পূর্ণতা মোর শত মনীশীর জন্মদানে৷৷

আমার পূর্ণতা নিশাবসানের হুংকারে৷

আমার পূর্ণতা দশভূজার রণ ঝংকারে৷৷

নারী হল একজন পূর্ণ মানব৷  সৃষ্টির ঊষালগ্ণ হতে নারী  আপন জীবন তুচ্ছ করে নতুন প্রজন্মকে ধারণ, বহন ও পালন করে চলেছেন, নারীরা তাঁদের সেবা ও ত্যাগ দিয়ে রচে গেছেন কালের কাহিনী৷ সেই অনিত্যের নিত্যপ্রবাহিনীর জয়গাথা শুনতে পাই কবির কন্ঠে---

‘‘জনে জনে রচি গেল কালের কাহিনী,

ভাবজড়তার বিরুদ্ধে সংগ্রাম

সমাজে এমন কিছু সুবিধাবাদী লোক থাকে যাদের স্বভাবই হ’ল মানুষকে শোষণ করা কিন্তু প্রকাশ্যে তারা সে কথা বলে না৷ বরং তারা মানুষকে কু–যুক্তি দেখিয়ে বলে–প্রকৃতি বা পরমাত্মার বিধানই এই যে সমাজের কিছু মানুষ চির অবহেলিত থাকুক৷ তারা জীবনভর শুধু অমানসিক পরিশ্রম করে যাক, আর সীমিত সংখ্যক লোক প্রাচুর্যের স্রোতে গা ভাসিয়ে সুখে শান্তিতে বাস করুক৷ এটাও ভাবজড়তা (Dogma)৷ যাঁরা বুদ্ধিমান, যাঁরা ধার্মিক তাঁরা অবশ্যই এর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ করবেন তথা আপোষহীন সংগ্রাম চালিয়ে যাবেন, কারণ মানুষের স্বাধীন বুদ্ধিকে যা কিছু অবরুদ্ধ করে তা’ মানুষের বুদ্ধির মুক্তিকেও সুদূরপরাহত করে৷

নারী–প্রগতি

আজকাল প্রায়ই নারী প্রগতি বলে একটা কথা অনেকের মুখে মুখে চলে আসছে৷ সেদিন রেডিও এফ. এম. গোল্ড এ প্রচারিত একটি অনুষ্ঠানে এই ‘‘নারী প্রগতি’’ কথাটা শুনে আমার মনে এ বিষয়ে কিছু লেখার ইচ্ছা প্রকট হয়৷

প্রাচীনকালে নারীর স্থান

(মহান দার্শনিক শ্রীপ্রভাতরঞ্জন সরকার তাঁর শব্দ চয়নিকা–২৬ খণ্ড গ্রন্থের বিভিন্ন স্থানে ‘নারীর মর্যাদা’ বিষয়ক অনেক কিছুই বলেছেন৷ ওই গ্রন্থ থেকে কিছু অংশ সংকলিত করে প্রকাশ করা হচ্ছে৷ –সম্পাদক)

অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা

এই সমাজে পুরুষেরা বিশেষ সুবিধাজনক অবস্থায় রয়েছে৷ পুরুষদের ওপর অর্থনৈতিক নির্ভরতার জন্যে পরিত্যক্তা নারীদের একাংশ পতিতাবৃত্তি গ্রহণ করতে ৰাধ্য হয়৷ যখন সমাজে নারীরা অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও পুরুষের সমান মর্যাদা পাবে তখন এই ধরণের বৃত্তি ৰন্ধ হয়ে যাবে৷ যে সব নারী ওই জঘন্য বৃত্তি পরিত্যাগ করে নিজের চরিত্র শুধরে নেবেন, সেই সব নারীকে উপযুক্ত মর্যাদা সমাজকে দিতে হবে৷ পতিতাবৃত্তি সামাজিক–র্থনৈতিক ব্যবস্থার কুফল৷

শিবোক্তি

জীবজগৎ যেমন মুখ্যতঃ দুই বিভাজনে বিভক্ত–যুথবদ্ধ ও এককজীবী, ঠিক তেমনি ঘর–সংসারের ব্যাপারেও জীবজগৎ দুই ভাগে বিভক্ত৷ এক ঃ ঘরকন্না করা সংসারী (যেমন হাতী, সিংহ, পায়রা প্রভৃতি) দুই ৪ স্বৈরী বা স্বীৈরিণী (যেমন বাঘ, কুকুর, ছাগল, বেহাল প্রভৃতি)৷

প্রাগৈতিহাসিক সমাজ

প্রাগৈতিহাসিক যুগের মানুষ–সমাজে নারীর স্থান ছিল অন্যান্য যে কোন জীবের স্বাধীন নারীর মতই৷ পুরুষেরা যেমন প্রকৃতির কোলে নেচে গেয়ে হেসে খেলে জীবন কাটিয়ে দিত নারীরাও তা–ই করত৷ এই অবস্থা চলেছিল যখন মানুষ সমাজ বলতে কোন কিছুই গড়েনি তখন তো বটেই, তার পরেও মাতৃশাসনের যুগেও৷ কিন্তু যখনই পিতৃশাসিত সমাজ ব্যবস্থা এল তখনই নারীর অধিকার ক্রমশঃ সঙ্কুচিত করা হতে থাকল৷ গোড়ার দিকে ঠিক করা হ’ল মেয়েরা ততটুকু স্বাধীনতা ভোগ করবে যতটুকু বিবাহের পরে তার শ্বশুরকুল তাকে ভোগ করতে দেবে বা বিবাহের পূর্বে পিতৃকুল তাকে যে সুযোগটুকু দেবে৷

সামাজিক সুবিচার ঃ নারী

অধিকাংশ জীবের মত মানুষের সমাজেও নারীরা শারীরিক বিচারে পুরুষের চাইতে দুর্বল৷ স্নায়ুর দুর্বলতার জন্যে মনও তাদের কিছুটা দুর্বল৷ কিন্তু তা সত্ত্বেও সমাজের কাছে তাদের মূল্য পুরুষের চাইতে এক পাইও কম নয়৷ স্বার্থপর পুরুষ কিন্তু এই মূল্যবোধের অপেক্ষা না রেখে নারীর দুর্বলতার সুযোগটুকুই ষোল আনা নিয়েছে ও নিচ্ছে৷ মুখে মাতৃজাতি বলে’ ঘোষণা করলেও আসলে তাদের অবস্থাটা করে’ রেখেছে ঠিক গৃহপালিত গোরু–ভেড়ার মত৷ একথা খুবই সত্যি যে কতকগুলি বিশেষ ক্ষেত্রে যোগ্যতার অভাবের ফলেই নারীরা ধীরে ধীরে তার অধিকার বা স্বাধীনতা খুইয়ে বসেছে, আর এই জন্যেই যাঁরা বিশেষ বিশেষ কতকগুলি যোগ্যতাকেই অধিকার প্রাপ্তির একমাত্র চাবিকাঠি হিস

মদালসা ও গন্ধর্ববিবাহ

‘গন্ধর্ব’ শব্দটি যদি পুংলিঙ্গে ব্যবহূত হয় (গন্ধর্বঃ) তার মানে হয় গন্ধর্ব অর্থাৎ নৃত্যে গীতে বাদ্যে দক্ষ এক প্রকারের দেবযোনি যা’ তেজ, মরুৎ আর ব্যোম এই তিনটি তত্ত্বে তৈরী অর্থাৎ যাতে ক্ষিতি ও অপ্ তত্ত্ব নেই, আর ক্ষিতি ও অপ্ তত্ত্ব না থাকায় সাধারণভাবে তা’ পরিদৃশ্য নয়৷ গন্ধর্ব–প্রেষিত ধ্বনি, রাগাত্মিকা অভিব্যক্তি শ্রুতিগ্রাহ্য, অনুভব্য কিন্তু স্বাভাবিক অবস্থায় দৃশ্য নয়৷ মনকে নিজের ক্ষিতি, অপ্ তত্ত্ব থেকে বিচ্যুত করে সম্পূর্ণতঃ ঔর্ধ্বদৈহিক ভাবে নিষিক্ত করতে পারলে তবেই তা’ মানসলোকে দৃশ্য৷

গন্ধর্ব একটি দেবযোনি যা’ কতকটা অপ্সরা পর্যায়ভুক্ত৷

শিবজায়া পার্বতী

এবার বলতে হয় পার্বতীর কথা৷ ‘পার্বতী’ শব্দটার মানে কী? কেউ হয়তো বলবেন ‘পর্বতস্য দুহিতা’, ‘পর্বতস্য কন্যা’ ইত্যর্থে পার্বতী (ষষ্ঠী তৎপুরুষ) অর্থাৎ পাহাড়ের মেয়ে৷ এখন প্রশ্ণ হচ্ছে, পঞ্চভূতাত্মক শরীরে কোন নারী কি পাহাড়ের মেয়ে হতে পারে? কোন নদীকে বরং পাহাড়ের মেয়ে বললেও বলতে পারি৷ কোন নারীকে পাহাড়ের মেয়ে বলতে পারি কি?