গণতন্ত্রের বেদীতে ফ্যাসিবাদের জন্ম দিয়েছিল দেশীয় পুঁজিপতিরা স্বাধীনতার আগেই সুভাষচন্দ্রকে ভারতীয় রাজনীতি থেকে নির্মুল করতে৷ ১৯৩৮ সালে কংগ্রেস সভাপতি হয়ে সুভাষচন্দ্র লণ্ডনে ভারতীয় ছাত্রদের সামনে বলেছিলেন--- ‘দেশীয় পুঁজিপতিরা ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদকে শক্তি যোগাচ্ছে৷’ সুভাষচন্দ্র রাজনৈতিক স্বাধীনতার পাশাপাশি জনগণের অর্থনৈতিক স্বাধীনতার কথাও বলেছিলেন৷ সেদিন আর কোন রাজনৈতিক নেতার এই কথাটা বলার সাহস ছিল না৷ যদিও গান্ধী ও তাঁর অনুগামীরা বিষটি জানতেন৷
এ হেন ব্যষ্টি দ্বিতীয়বার কংগ্রেস সভাপতি হোন সেটা দেশীয় পুঁজিপতিরা চায়না৷ তাছাড়া ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে শক্তি যোগানোর পাশাপাশি দেশীয় পুঁজিপতিরা জাতীয় কংগ্রেসের গান্ধী ও তাঁর অনুগামীদের নিয়ন্ত্রণ করতো৷ তাই দ্বিতীয়বার সভাপতি নির্বাচনে সুভাষচন্দ্রের প্রার্থী হওয়ার তীব্র বিরোধিতা করে স্বয়ং গান্ধীও৷ তবু ১৯৩৯ সাল সুভাষ যখন গান্ধীর অমতে গান্ধী মনোনীত প্রার্থী সীতারামাইয়ার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে দ্বিতীয় বারের জন্যে কংগ্রেস সভাপতি নির্বাচিত হলেন তখনই অহিংসার পূজারী (!) গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিশ্বাসী জাতীয় কংগ্রেসের গান্ধী লবির ফ্যাসিষ্ট চেহারা নগ্ণভাবে প্রকাশ হয়ে পড়লো৷ দেশীয় পুঁজিপতিদের মদতে সেদিন সুভাষচন্দ্রকে কংগ্রেস থেকে তাড়াতে গান্ধীবাদী নেতারা যে নিকৃষ্ট নির্মম আচরণ করেছিল তা ফ্যাসিবাদকেও লজ্জা দেবে৷ গান্ধীপন্থিরা সেদিন কংগ্রেসের মঞ্চ থেকে গান্ধীর নামে জয়ধবনি দিয়েছিল---‘হিন্দুস্থান কা হিটলার গান্ধীজী কি জয়৷ অনুগামীরা হিটলারের সঙ্গে তুলনা করায় গান্ধীও হয়তো আনন্দে আপ্লুত হয়েছিলেন৷ তাই কোন প্রতিবাদ করেননি৷ প্রতিবাদ করেছিলেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর৷ ভারতীয় রাজনীতির রঙ্গমঞ্চে সেইদিনেই ফ্যাসিষ্টের সাপ ফোঁস করে উঠেছিল পশ্চিম প্রান্ত থেকে৷
১৯৪৭ সালের ১৫ই আগষ্ট মধ্যরাতের অন্ধকারে জাতীয় কংগ্রেসের ব-কলমে ক্ষমতা হস্তান্তর হয়েছিল দেশীয় পুঁজিপতিদের হাতে৷ অর্থনৈতিক ক্ষমতার পাশাপাশি পরোক্ষভাবে রাজনৈতিক ক্ষমতার নিয়ন্ত্রন নিল দেশীয় পুঁজিপতিরা৷ তার আগেই সুভাষচন্দ্র কংগ্রেস ছাড়া দেশছাড়া হয়েছেন৷ তবু বাঙালীকে বিশ্বাস নেই৷ তাই বাঙালী জনগোষ্ঠীকেই নির্মূল করার ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র রচিত হল ওই ১৯৪৭ সালের ১৫ই আগষ্ট মধ্যরাতে৷
ভারত থেকে বাঙালীকে নির্মূল করার দেশীয় পুঁজিপতিদের ষড়যন্ত্র পুর্র্ণঙ্গরূপ পেতে সময় লাগলো ৬৭ বছর৷ ওই সময়ের মধ্যে অর্থনীতিতে, শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতিতে বাঙালীকে পঙ্গু করে দিয়েছে দিল্লির কেন্দ্রীয় সরকার৷ ওই পুঁজিপতিপতিদের পৃষ্ঠপোষকতায় ২০১৪ সালে দেশবাসীর মনে অনেক আশা জাগিয়ে ক্ষমতায় আসীন হলো নরেন্দ্র মোদি৷ ১১ বছরেই তার ফ্যাসিষ্ট চেহারা নগ্ণ হয়ে প্রকাশ পেল৷ একে একে গণতন্ত্রের স্তম্ভগুলিকে কব্জায় নিয়ে ফ্যাসিষ্ট রূপ ধারণ করেছে৷ গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে বিরোধীদের৷ সেই বিরোধীদের কন্ঠ রুদ্ধ করে দেওয়া হচ্ছে! ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের আবাজ তুলে জনগণকে মিথ্যা প্রতিশ্রুতিতে ভুলিয়ে পুঁজিপতিদের পকেট ভারী করে চলেছে প্রধানমন্ত্রী৷ আসলে প্রধানমন্ত্রীও কেউ নয়, সামাজিক. অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক সর্বক্ষেত্রে দেশের নিয়ন্ত্রক পুঁজিপতিরাই৷ তাদেরই অঙ্গুলী হেলনে এন.আর.সি, সিএএ এমনকি এস.আই.আর-এর মত ভোটার তালিকা সংশোধনের সাধারণ প্রক্রিয়াকেও সাম্প্রদায়ীকতার বিষে জারিত করে বাঙালী বিতাড়ণের অস্ত্রে পরিণত করা হয়েছে৷
তাই স্বাধীনতার ৭৮ বছর পরেও দেশ থেকে অনুপ্রবেশের অভিশাপ দূর হলো না৷ আজও বাঙালীকে বলি দিতে সেই অনুপ্রবেশের খাঁড়া সঙ্গে গোটা দেশ থেকে গণতন্ত্রকে মুছে দেবার ফ্যাসিষ্ট হুঙ্কার সেই পশ্চিম থেকেই৷ এসবের পিছনে আছে সেই পশ্চিমি পুঁজিপতি যাদের ষড়যন্ত্রে সুভাষচন্দ্র হারিয়ে গেছেন, ৭৮ বছরে বাঙালী জনগোষ্ঠীকেও আঁতে ও ভাতে মেরে অনেকটাই নির্বিষ করে দিয়েছে, তার অর্থনীতি গ্রাস করে নিয়েছে, শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতির অঙ্গনে অশ্লীল, হীনরুচির নিম্নমানের সংস্কৃতির স্রোত বহিয়ে দেওয়া হয়েছে---এক কথায় একটা জনগোষ্ঠীকে নির্মুল করতে যা যা করার শাসক ও শোষক গোষ্ঠী সে সবই বাঙালীর ওপর প্রয়োগ করা হয়েছে৷ এখন শুধু পশ্চাতে পদাঘাত করে সীমান্ত পার করা অথবা ডিটেনশন ক্যাম্প তৈরী করে বন্দি করে তিলে তিলে মারার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে৷
তবে বাঙালী কে চিনতে ব্রিটিশও ভুল করেছিল, তাই তাকে শিক্ষিত করে কেরানী বানাতে চেয়েছিল, কিন্তু সেই আই.সি.এস কেরানী থেকেই জন্ম নিয়েছিল অরবিন্দ, সুভাষচন্দ্র৷ এতেই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের ভিত কেঁপে গিয়েছিল ধসে গিয়েছিল, কোন অহিংসার পূজারী (!) বা মুচলেকা বীরের আঘাতে নয়৷ স্বাধীনতার ৭৮ বছরে ধনমান সম্পদ সব হারিয়ে বাঙালী আজ অবলুপ্তির পথে৷ কিন্তু না এত সহজে বাঙালী নির্মুল হবার নয়৷ ঊনবিংশ শতাব্দীর নব জাগরণের চেতনা, অগ্ণিযুগের উত্তাপ আজও বাঙালীর অন্তরে ফল্গু ধারার মতো বহে চলেছে৷ রাষ্ট্রের শাসন, পুঁজিপতির শোষণ উপেক্ষা করে হিন্দি অপ-সংস্কৃতির বালুরাশি ভেদ করে--- বাঙালী আর একটা অগ্ণি স্ফুলিঙ্গের অপেক্ষায়৷ শাসক-শোষক সাবধান!
- Log in to post comments