শ্রবণ, মনন ও নিদিধ্যাসন
শাস্ত্রীয় নির্র্দেশ অনুযায়ী মানুষের উন্নতির জন্যে তিনটি তত্ত্ব আবশ্যক৷ তিনটি তত্ত্ব কী?–না, শ্রবণ, মনন ও নিদিধ্যাসন৷ প্রথমে দেখা যাক্–শাস্ত্র বলতে কী ক্ষোঝায়?
শাস্ত্রীয় নির্র্দেশ অনুযায়ী মানুষের উন্নতির জন্যে তিনটি তত্ত্ব আবশ্যক৷ তিনটি তত্ত্ব কী?–না, শ্রবণ, মনন ও নিদিধ্যাসন৷ প্রথমে দেখা যাক্–শাস্ত্র বলতে কী ক্ষোঝায়?
গীতায় বলা হয়েছে–
‘‘যদা যদা হি ধর্মস্য গ্লানির্ভবতি ভারত৷
অভ্যুত্থানমধর্মস্য তদাত্মানং সৃজাম্যহম্৷৷
পরিত্রাণায় সাধূনাং বিনাশায় চ দুষ্কৃতাম্৷
ধর্মসংস্থাপনার্থায় সম্ভবামি যুগে যুগে৷৷’’
মানসপট আর মনের ময়লা
নির্গুণ ব্রহ্মের কোনো রূপ নেই৷ তিনি নিরাকার৷ এই ব্রহ্মই সগুণ ব্রহ্মরূপে (যা নির্গুণ ব্রহ্মের কার্যান্বিত রূপ), প্রকৃতির সহায়তায় ব্রহ্মভাবের জন্ম দেন, সেই সগুণ ব্রহ্ম প্রতিটি ধূলিকণায় ব্যাপ্ত আছেন৷ আমার মানসপটের ওপর ব্রহ্মের প্রতিচ্ছায়া পড়ছে, আর এই প্রতিচ্ছায়া কিরকম ভালভাবে পড়বে তা নির্ভর করে আমারই সংস্কারের ওপর৷ মানসপট যত মলযুক্ত হবে, তার ওপর ততখানিই খারাপ প্রতিফলন পড়বে৷ সাধনার দ্বারা আমরা মনের এই ময়লাকে পরিষ্কার করি৷
মানুষের সবচেয়ে বড় শত্রু কে? কেউ বলে ভয়, কেউ বলে হীনমন্যতা৷ সূক্ষ্মভাবে যদি দেখা যায় তাহলে ৰোঝা যাবে যে হীনমন্যতার জন্ম ভয় থেকেই৷
ভয় দু’প্রকারের– যা বাহ্যবস্তু থেকে আসে(external source) যার উদ্ভব আমাদের অন্তস্তলে(internal source)৷ একটি শরীরের ভয়, অন্যটি মনের ভয়৷ ধর, এক বড় পশু এসে গেল৷ সেটি ‘হালুম’ বলে তোমাকে খেতে চায়৷ স্বভাবতঃই তুমি ওখান থেকে পালিয়ে যাবে৷ এই শারীরিক ভয়ের পিছনে আছে আত্মরক্ষার চেষ্টা আর তা কোনো ব্যাধি নয়৷ এটা স্বাভাবিক ব্যাপার, আর মানুষ নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী এইসব পরিস্থিতিতে সামঞ্জস্য স্থাপন করে নেয়৷
প্রাচীনকাল থেকেই লোকে বলে আসছে যে পরমপুরুষকে পাবার তিনটে পথ–জ্ঞান, কর্ম ও ভক্তি৷ তারা বলে, জ্ঞানের মাধ্যমে মানুষ ৰুঝে নেয় পরমাত্মা কী, মানুষ কী ও পরমাত্মাকে পাওয়ার মানে কী৷ এখন বিচার করতে হবে, জ্ঞান দিয়ে মানুষ কী ভাবে ৰুঝবে পরমাত্মা কী৷ মানুষের জ্ঞান–ৰুদ্ধির দৌড় আর কতদূর৷ মানুষের ব্রেন তো খুবই ছোট আর সেই ব্রেনও সে পেয়েছে পরমপুরুষের কাছ থেকেই,পরমাত্মার কাছ থেকেই৷ সেই ব্রেন দিয়ে সে কীভাবে পরমপুরুষকে পরিমাপ করবে সে কীভাবে ৰুঝবে পরমপুরুষ কেমন তাই লোকেরা যে বলে, মানুষ জ্ঞানের দ্বারা ৰুঝবে পরমপুরুষ কী, পরমাত্মা কী– একথা কতদূর সত্যি?
শাস্ত্রে বলা হয়েছে, ‘প্রণিপাতেন পরিপ্রশ্ণেন সেবয়া’–মানুষ প্রণিপাত, পরিপ্রশ্ণ ও সেবা–এই তিনের সহায়তায় অর্থাৎ এই তিনের সমন্বয়ে পরমপুরুষের কাছে পৌঁছতে পারে৷ সাধক জীবনে সেবা তাই অনিবার্য৷ সেবার ভাবনা না থাকলে, দরজা বন্ধ করে বিশ ঘণ্ঢা সাধনা করলেও কোনো উন্নতি হবে না কারণ পরমপুরুষের আসন তোমার হৃদয়েও আছে, আবার বাইরেও আছে৷ তুমি ভিতরের আসনকে উজ্জ্বল করতে চাইবে, সেখানে দীপ জ্বালাবে আর বাইরের আসনকে অন্ধকারে রেখে দেবে, এতে কাজ হবে না৷ দীপ ভিতরেও জ্বালাতে হবে, বাইরেও জ্বালাতে হবে৷
এখন ভারতবর্ষ ও আধ্যাত্মিকতা সম্পর্কে কিছু আলোচনা করা যাক৷ এই দেশের নাম ভারতবর্ষ৷ জানতো, পৃথিবীতে যা কিছু শব্দ আছে সবই অর্থপূর্ণ৷ গ্রামের নামই হোক বা নদীর নাম, সবেরই একটা অর্থ আছে৷ এ দেশের নাম ভারতবর্ষ কেন রাখা হ’ল? প্রাচীনকালে এখানকার বাসিন্দা ছিল দ্রাবিড়, অষ্ট্রিক ও মঙ্গোলিয়ন৷ আর্যরা যখন এল তখন তারা এর নামকরণ করলে ‘ভারতবর্ষ’৷ এমন নাম কেন করা হ’ল?
সৃষ্টির প্রারম্ভের আগের কথা৷ সে সময় দেশ–কাল–পাত্রের মত সাপেক্ষ সত্তা ছিল না৷ একমাত্র ছিল অখণ্ড অসীম, ক্ষৃহৎ, সর্বব্যাপী সত্তা, আর সেই সত্তার সাক্ষিত্বরূপে ছিলেন পরমপুরুষ৷ সেই অখণ্ড সৃষ্টির রচয়িতা পরমপুরুষ নিজেকেই অনেক রূপে নানাপ্রকারে অভিব্যক্ত করলেন৷
‘‘ত্বং স্ত্রী ত্বং পুমানসি, ত্বং কুমার উত বা কুমারী৷
ত্বং জীর্নোদণ্ডেন বঞ্চয়সি ত্বং জাতো ভবসি বিশ্বতোমুখঃ৷’’
‘‘নীলঃ পতংগো হরিতো লোহিতাক্ষ
স্তত্তিদ্গর্ভ ঋতবঃ সমুদ্রাঃ৷
অনদিমত্বং বিভুত্বেণ বর্ত্তসে
যতোজাতানি ভুবনানি বিশ্ব৷৷’’
একটা গল্প আছে যে এক জ্ঞানী আর এক ভক্ত আমবাগানে গেল৷ জ্ঞানী পর্যবেক্ষণ করা শুরু করল–এগুলি ল্যাংড়া আম, না হিমসাগর, না অন্য কোনো প্রজাতির আম৷ পৃথিবীতে প্রায় পনেরশো প্রজাতির আম আছে৷ জ্ঞানী দেখতে শুরু করল যে বাগানে আরও কত রকমের আম গাছ আছে৷ এই বিশ্লেষণ অনেকক্ষণ পর্যন্ত চলতে চলতে শেষ পর্যন্ত সূর্যাস্ত হ’ল আর আমের বাগানে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো৷ তখন জ্ঞানী তাড়াতাড়ি আবার কোন্ গাছে কত পাতা আছে, কত শাখা–প্রশাখা আছে, তা গুনতে শুরু করল৷ রাত বাড়তে থাকল৷ কিন্তু এর মধ্যে ভক্ত কী করল?
‘‘যাবন্নক্ষীয়তে কর্ম শুভঞ্চাশুভমেবচ,
তাবন্নজায়তে মোক্ষো ণৃণাং কল্পশতৈরপি৷
যথা লৌহময়ৈঃ পাশৈঃ পাশৈঃ স্বর্ণময়ৈরপি,
তথা ৰদ্ধো ভবেজ্জীবো কর্মাভিশ্চ শুভাশুভৈঃ৷৷’’
(তন্ত্র)