(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
বুদ্ধি মানুষের সমস্ত কর্মকেই নিয়ন্ত্রণ করে, কিন্তু মদ্যপান তাকে ধ্বংস করে দেয়৷ মদ তাই অত্যন্ত খারাপ জিনিস৷
জড়বাদও সমানভাবে খারাপ৷ এও ৰুদ্ধিকে ধ্বংস করে দিয়ে মানুষকে ইট–পাথরে পরিণত করে দেয়৷ জড়বাদী দর্শন তাই সমাজের পক্ষে একজন ডাকাতের চেয়েও বেশী বিপজ্জনক৷ তোমাদের জড়বাদী দর্শনের বিরুদ্ধে প্রাণপণ লড়াই করতে হবে, কারণ এটা মানবতার সবচেয়ে বড় শত্রু৷
একদিক দিয়ে দেখতে গেলে জড়বাদীরা মানুষকে গভীর অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেয়৷ আলো একটা নিয়ম মেনে চলে৷ যখন এটা বিচ্ছুরিত হয় সাতটা রঙে ভাগ হয়ে যায়–বেগুনী, নীল, আকাশী, সবুজ, হলুদ, কমলা ও লাল৷ সেইভাবে ভূমামনের লোকেও সাতটা স্তর৷ অব্যক্ত বিশ্ব এই সপ্তলোকের ঊর্দ্ধে–সেখানে কোন কলা [ৰীজ] নেই৷ এই অবস্থায় ব্রহ্মকে নিষ্কল [ৰীজহীন] বলা হয়৷ আর আমাদের এই পৃথিবী ‘সকল’ [সৰীজ]৷ এই পৃথিবী সকল ব্রহ্ম আর নির্গুণাবস্থা, নিষ্ক্ল ব্রহ্ম৷ সেই সপ্তলোকের ঊর্দ্ধে কী আছে? কেবল শুভ্র জ্যোতি, কোন রঙ নেই৷ শাদা কোন রঙ নয়৷ সব রঙের সমাহার হ’ল ‘শাদা’৷
একইভাবে নীচেও সাতটা লোক আছে৷ সেগুলো হচ্ছে–তল, অতল, বিতল, তলাতল, পাতাল, অতিপাতাল ও রসাতল৷ রসাতল সবার নীচে এই সপ্তলোকের রঙ কালো৷ কালো কোন রঙ নয়৷ রঙের অভাবই হচ্ছে কালো, সেজন্যে আমরা কালো দেখি৷ কালোরও আবার তারতম্য আছে৷ সব কালোই সমান নয়৷ উদাহরণস্বরূপ, সবচেয়ে কালো চামড়ার অষ্ট্রিক জাতির লোকেরাও নিগ্রোদের মত কালো নয় না তো তারা দ্রাবিড়দের মত কালো৷
যারা সপ্তলোকের সাধনা করে, তারা সেখানে রঙের কোন তফাৎ দেখে না৷ তারা তাই জাতিবাদ মানে না৷ তাদের কাছে সব মানুষই সমান৷ বিপ্র, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্রের বিভাজন তাদের কাছে কোন অর্থ রাখেনা৷ তাদের কাছে সকলেই এক ও সমান৷ তাই বলা হয়েছে–
‘‘বর্ণাশ্রমাভিমানেন শ্রুতিদাস্যে ভবেন্নরঃ৷
বর্ণাশ্রমবিহীনশ্চ বর্ত্ততে শ্রুতি মূর্ধনি৷৷’’
সেই অবস্থায় সাধক শাস্ত্রের ওপরে উঠে যায়৷
নীচের সাতটা লোকেরও স্তর অনুযায়ী সাত রকমের কালো রয়েছে৷ সেগুলো কী? ‘তমঃ’ মানে সাধারণ কালো, দ্বিতীয় হ’ল ‘তমসা’, তৃতীয় মহাতমসা, চতুর্থ অন্ধ তমসা, পঞ্চম তমিস্রা, ষষ্ঠ মহাতমিস্রা ও সপ্তম অন্ধতমিস্রা৷ এটা এমনই কালো যে এতে নিজের হাতও দেখা যাবে না৷ যখন কেউ জড়বাদী হয়ে যায়, চরম জড়বাদী তখন তার বিবেকৰুদ্ধি হারিয়ে যায়৷ সে তখন যে হাতে ঘুষ নিচ্ছে বা মদের কাপকে ধরছে সেই হাতটাও দেখতে পায় না৷ সে ভাবে, ‘‘আমি যা করছি ঠিক করছি৷’’ তাই বলা হয়েছে ‘অন্ধং তমঃ প্রবিশন্তি’৷ –জড়বাদী মানুষ পতিত হয়, সে নীচের রসাতলে চলে যায়৷ রসাতল কুকুর–ছাগলের চেয়েও অনেক নিম্নস্তর৷ কুকুর–ছাগল ‘ভূবর্লোকে’র নীচে কখনও যায় না৷ তারা রসাতলের অনেক ওপরে৷ কারণ তাদের শারীরিক দেহটা ভূর্লোকে আর স্থূল মানসদেহটা থাকে ভুবর্লোকে৷ পশুদের পতন হয় না৷ মানুষেরই পতন হয়, আবার উত্থানও হয়৷
নদী উঁচু থেকে নিচুর দিকে বয়৷ গঙ্গোত্তরী গঙ্গার দিকে প্রবাহিত হয়৷ গঙ্গা প্রবাহিত হয় গঙ্গাসাগরের দিকে৷ কিন্তু গঙ্গাসাগর কখনও গঙ্গার দিকে ফিরে যায় না, না গঙ্গা যায় গঙ্গোত্তরীর দিকে কারণ নদী সব সময় নীচের দিকে বয়ে যায়৷ কিন্তু মানুষের মনের গঙ্গা দু’দিকেই বয়৷ এই মনের গঙ্গা গঙ্গোত্তরী থেকে গঙ্গার দিকেও যায়, আবার বিপরীত দিকেও বইতে পারে৷ তোমাদের তাহলে কী ভাবা দরকার? তোমাদের ভাবা দরকার, ‘‘আমি গঙ্গাসাগর থেকে গঙ্গোত্তরীর দিকে যাব৷’’
জড়বাদীরা মানবাধার থাকা সত্ত্বেও সাধনা করে না৷ এই পৃথিবীতে কোনকিছুই স্থির নয়৷ সবকিছুই চলে চলেছে৷ কেউ যদি ওপরের দিকে না যায়, নিজের আত্মিক উন্নতির জন্যে চেষ্টা না করে, তাহলে তাকে অবশ্যই নীচের দিকে যেতে হবে–কারণ চলমানতা আবশ্যিক–যদি ওপরের দিকে না হয় তাহলে নীচের দিকে যেতে হবে৷ প্রত্যেকেরই তাই চেষ্টা করা দরকার৷ যে যেখানে রয়েছে সেখানেই স্থির থাকার কথা চিন্তা করা উচিত নয়৷ বস্তুতঃ, তুমি যেখানে রয়েছ সেখানেই থাকা সম্ভব নয়৷ যদি তোমার গতি ওপরের দিকে না হয় তাহলে তোমাকে নীচের দিকে যেতে হবে৷ তাই ৰুদ্ধিমান স্ত্রী–পুরুষ ওপরের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করবে৷
এখনই তোমাদের এগিয়ে চলার যাত্রা শুরু করা দরকার৷ অতীতে যত বড় অপরাধই তুমি করে থাক না কেন, এই মুহূর্ত্ত থেকে সামনের দিকে এগিয়ে চল৷ কাল তুমি কী হতে চাও তা আজই ভাবা দরকার৷