আধ্যাত্মিক প্রসঙ্গ

আধ্যাত্মিক প্রগতির তিনটি সোপান

‘প্রণিপাতেন পরিপ্রশ্ণেন সেবয়া৷’ আধ্যাত্মিক প্রগতি তিনটি তত্ত্বের ওপর নির্ভরশীল–প্রণিপাত, পঙ্গিরপ্রশ্ণ, সেবা৷ ‘প্রণিপাত’ মানে এক অদ্বিতীয় শাশ্বত সত্তা পরমপুরুষের প্রতি পূর্ণ আত্মসমর্পণ৷ এক্ষেত্রে সাধকের মনোভাব হচ্ছে এই যে বিশ্বের যা কিছু সবই পরমপুরুষের, আমার বলতে কিছু নেই৷ এটা হ’ল প্রণিপাত৷ আর যার অহংবোধ রয়েছে, যে ভাবছে তার বিদ্যা–বুদ্ধি, ধন–সম্পত্তি বা অন্যান্য যাবতীয় বস্তু তার বৈয়ষ্টিক সম্পত্তি, সে সবচেয়ে বড় মূর্খ৷

বর্ণমাহাত্ম্য

এই মহাবিশ্ব অজস্র  স্পন্দনের  সমাহার৷ এই যে পরিদৃশ্যমান জগৎ যাকে  সাধারণভাবে ‘প্রপঞ্চ’ আখ্যায়  অভিহিত  করে থাকি তা মূলতঃ মানস জগৎ ও  অতিমানস জগতের  অধিক্ষেত্রভুক্ত৷ এই স্পন্দনরাজি সংখ্যায় অসংখ্য...অগুন্তি কিন্তু অনন্ত নয়৷ যদি  তারা অনন্ত  হত তাহলে  সৃষ্টিটাও অনন্ত হত৷  তবে হ্যাঁ, তরঙ্গ-রাজির  সংখ্যা  অজস্র...অগণিত৷ কিন্তু তা কোনোমতেই অনন্ত নয়৷

শ্রাবণী পূর্ণিমা

.....আমাদের এই শ্রাবণী পূর্ণিমা–অনেকেই জান, এটা জানা জিনিস৷ আমি তখন খুবই ছোট্ট৷ তখন বিদ্যাসাগর কলেজে পড়ি৷ একদিন সন্ধ্যায় একটা ঘটনা ঘটল৷ একজন লোক–সে লোকটি দুষ্ট প্রকৃতির ছিল৷ আমরা এই কথাটা ব্যবহার করছি এই জন্যে যে আজ যে মানুষটা দুষ্ট, কাল সে সাধু হতে পারে৷ আজ যে মূঢ় কাল সে জ্ঞানী হতে পারে–এ সবকিছু আপেক্ষিক জগতের আপেক্ষিকতার দ্বারা অভিষিক্ত৷ তাই এর কোন শাশ্বত রূপ নেই৷ কোন মানুষকে স্থায়ীভাবে দুষ্ট বলা চলে না৷ সব সময় মনে রাখতে হবে যে আমি এই দুষ্টের ভেতরে যে ভাল জিনিসগুলো নিহিত রয়েছে সেইগুলোকেই জাগিয়ে দিয়ে, বাড়িয়ে দিয়ে একে ভাল করে তুলবো৷ ভাল মানে কী?–না, সংস্কৃত ‘ভদ্র’ শব্দ থেকে ‘ভাল’ শব্দটা এসে

আদর্শ জীবন

শ্রীশ্রীআনন্দমূর্ত্তি

                ‘‘যচ্ছেদ্ বাঙ্মনসী প্রাজ্ঞস্তদ্

                                যচ্ছেদ্জ্ঞান আত্মনি৷

                জ্ঞানমাত্মনি মহতি নিযচ্ছেৎ

                                তদ্ যচ্ছেচ্ছান্ত আত্মনি৷৷’’

পশুপতি, বীরেশ্বর ও মহাদেব

আজকাল কিছু কিছু দ্ধিজীবী জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রগতি সম্পর্কে আলোচনায় মুখর৷ প্রথমতঃ, প্রগতি জিনিসটা সরলরেখায় চলে না৷ প্রগতি ব্যাপারটা হ’ল সংকোচ বিকাশী ও ছন্দায়িত৷ দ্বিতীয়তঃ, মনে রাখতে হবে যে প্রগতির গতি স্থানবিশেষে ও ক্ষেত্র অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন হয়৷ কোন্ ক্ষেত্রে প্রগতি ঘটছে, তদনুযায়ী প্রগতির গতি  পরিবর্তিত হয়৷

ওঁ–কার ও ইষ্টমন্ত্র

এখন সংক্ষেপে ‘‘ওঁকার ও ইষ্টমন্ত্র’’ সম্বন্ধে তোমাদের কিছু বলব৷ জেনে বা না জেনে প্রতিটি জৈবিক সত্তা পরমপুরুষকে ভালবাসে, তাঁর ভালবাসা পেতে চায়৷ আর সৃষ্টির ঊষালগ্ণ থেকেই (আমি মানুষের সভ্যতার শুরু থেকে না বলে বলছি মানুষ সৃষ্টির প্রথম অবস্থা থেকে) তাদের সমস্ত আশা–আকাঙক্ষা জ্ঞাতে–জ্ঞাতে সেই পরমপুরুষের দিকেই প্রধাবিত হয়ে চলেছে৷

ওঁম্–কার কী?  বেদে ওঁম্–কার সম্বন্ধে বলা হয়েছে–

‘‘সবে বেদা যৎপদমামনন্তি তপাংসি সর্বাণি চ যদ্ বদন্তি৷

যদিচ্ছন্তো ব্রহ্মচর্যং চরন্তি তত্তে পদং সংগ্রহেণ ব্রুবীম্যোমিত্যেতদ্৷৷’’

তন্ত্রের কয়েকটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য

ক’দিন ধরেই আমি বলেছি ও বলে চলেছি যে তন্ত্রের একটা বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা প্রচলিত অন্য সব কিছু থেকেই আলাদা৷ আনন্দমার্গ যদিও মুখ্যতঃ তন্ত্রাশ্রয়ী কিন্তু আনন্দমার্গের আরও অনেকগুলো নিজস্ব বৈশিষ্ট্য রয়েছে৷ প্রথমতঃ আমি বলেছি, আমাদের আদর্শ অনুযায়ী কোন অবস্থাতেই কোন মানুষের ভয় পাবার কোন সঙ্গত কারণ নেই৷ তা সত্ত্বেও যদি কোন মানুষ ভয় পায়, বুঝতে হবে সে আদর্শবিরোধী কাজ করছে, যা তার করা উচিত নয় তেমন কাজ সে করছে৷ সুতরাং মনে রেখো, এমন কোন পরিস্থিতিই পৃথিবীতে আসতে পারে না যে পরিস্থিতিতে তোমাদের ভীত হবার দরকার পড়বে৷ বলা হয়েছে, পরমপুরুষ ভয়ের কাছেও ভয় অর্থাৎ মানুষ ভয়কে যেমনটি মনে করে, ভয় পরমপুরুষকে তেমনটি মনে করে৷

বেদ ও তন্ত্রের মৌলিক পার্থক্য

তন্ত্রের সঙ্গে বেদের আদর্শগত তফাৎ বেশী বললে যথেষ্ট হবে না, বলা উচিত খুব বেশী৷ তন্ত্র হ’ল সম্পূর্ণ বৈবহারিক (Practical), তন্ত্র অস্বাভাবিক কোন কিছুকে সমর্থন করে না৷ ফলে তন্ত্রের মধ্যে স্বাভাবিরতা থাকায় সেটা সমাজে সহজেই গৃহীত ও সহজেই আদৃত হয়৷ মানুষ একে সহজেই নিজের জিনিস বলে মনে করতে পারে৷ যেমন বেদে একটা শ্লোকে আছে---‘উত্তিষ্ঠত জাগ্রত প্রাপ্য ররান্ নির্োধত’--- ওঠো, জাগো, উপযুক্ত আচার্যের নিকট সত্বর উপস্থিত হও ও সাধনা মার্গে চলতে শুরু করো৷ এতখানিতে বেদ ও তন্ত্রে মিল আছে৷

পরমপুরুষের অনেক নাম

গোপাল ঃ পরমপুরুষের একটি নাম হ’ল গোপাল৷  সংস্কৃতে ‘গো’ অর্থে কর্মেন্দ্রিয় ও জ্ঞানেন্দ্রিয় উভয়কেই  বোঝায়, আর  ‘পাল’ মানে  যিনি পালন  করেন৷

ধর, একটা মানুষ৷ এখন তার কেবল শরীরটাই রয়েছে, মন নেই আত্মা  নেই কিংবা চিতিশক্তি বা ভূমাচৈতন্যও অবর্ত্তমান ৷ তাহলে সেই  মানুষটা সমস্ত ইন্দ্রিয় থাকা সত্ত্বেও  কাজ করতে পারবে না৷ গোপাল মানে হ’ল জীবাত্মা.....অণুচৈতন্য৷

গোবিন্দ ঃ সংস্কৃতে ‘গো’ মানে হ’ল কর্মেন্দ্রিয় ও জ্ঞানেন্দ্রিয়  সমূহ৷ আর ‘বিন্দ’ মানে যিনি কোনো  সত্তা  বিশেষের বৈশিষ্ট্যকে স্ফূর্ত্তি ও প্রগতির  ব্যাপারে  সহায়তা করেন৷ তাই ‘গোবিন্দ’ মানেও  দাঁড়াচ্ছে অণুচৈতন্য ৷